পরিশিষ্ট ৪

Rabindranath Tagore

পরিশিষ্ট ৪
এই-সব গান কোনো রবীন্দ্র-নামাঙ্কিত গ্রন্থে বা রচনায় নাই। নানা
জনের নানা সংগীতসংকলনে বা রচনায় ছড়ানো আছে। পরবর্তী
গ্রন্থপরিচয় দ্রষ্টব্য।

ভাসিয়ে দে তরী তবে নীল সাগরোপরি।
বহিছে মৃদুল বায়, নাচিছে মৃদু লহরী।
ডুবেছে রবির কায়া, আধো আলো, আধো ছায়া-
আমরা দুজনে মিলি যাই চলল ধীরি ধীরি।
একটি তারার দীপ যেন কনকের টিপ
দূর শৈলভুরুমাঝে রয়েছে উজল করি।
নাহি সাড়া, নাহি শব্দ, মন্ত্রে যেন সব স্তব্ধ—
শান্তির ছবিটি যেন কী সুন্দর আহা মরি।

ছিলে কোথা বলো, কত কী যে হল
জান না কি তা? হায় হায়, আহা!
মানদায়ে যায় যায় বাসবের প্রাণ—
এখানে কী কর, তুমি ফুলশর
তারে গিয়ে করো ত্রাণ।

চলো চলো, চলো চলো, চলো চলো ফুলধনু,
চলো যাই কাজ সাধিতে।
দাও বিদায় রতি গো!
এমন এমন ফুল দিব আনি
পরখিবে মানিনীহৃদয়ে হানি,
মরমে মরমে রমণী অমনি
থাকিবে গো দহিতে।

এসো গো এসো বনদেবতা, তোমারে আমি ডাকি।
জটার ’পরে বাঁধিয়া লতা বাকলে দেহ ঢাকি
তাপস, তুমি দিবস-রাতি নীরবে আছ বসি—
মাথার ’পরে উঠিছে তারা, উঠিছে রবি শশী।

বহিয়া জটা বরষা-ধারা পড়িছে ঝরি ঝরি,
শীতের বায়ু করিছে হাহা তোমারে ঘিরি ঘিরি।
নামায়ে মাথা আঁধার আসি চরণে নমিতেছে,
তোমার কাছে শিখিয়া জপ নীরবে জপিতেছে।

একটি তারা মারিছে উঁকি আঁধারভুরু-’পর,
জটার মাঝে হারায়ে যায় প্রভাতরবিকর।

পড়িছে পাতা, ফুটিছে ফুল, ফুটিছে পড়িতেছে—
মাথায় মেঘ কত-না ভাব ভাঙিছে গড়িতেছে।
মিলিয়া ছায়া মিলিয়া আলো খলিছে লুকাচুরি,
আলয় খুঁজে বনের বায়ু ভ্রমিছে ঘুরি ঘুরি।

তোমার তপ ভাঙাতে চাহে ঝটিকা পাগলিনী—
গরজি ঘন ছুটিয়া আসে প্রলয়রব জিনি,
ভ্রূকুটি করি চপলা হানে ধরি অশনিচাপ।
জাগিয়া উঠি নাড়িয়া মাথা তাহারে দাও শাপ।

এসো হে এসো বনদেবতা, অতিথি আমি তব—
আমার যত প্রাণের আশা তোমার কাছে কব।
নমিব তব চরণে, দেব, বসিব পদতলে—
সাহস পেয়ে বনবালারা আসিবে দলে দলে।

কত ডেকে ডেকে জাগাইছ মোরে,
তবু তো চেতনা নাই গো।
মেলি মেলি আঁখি মেলিতে না পারি,
ঘুম রয়েছে সদাই গো।
মায়ানিদ্রাবশে আছি অচেতন,
শুয়ে শুয়ে কত দেখি কুস্বপন—
ধন রত্ন দাস বিলাসভবন—
অন্ত নাহি তার পাই গো।

কল্পনার বলে উঠিয়া আকাশে
ভ্রমি অহরহ মনের উল্লাসে,
ভাবি না কী হবে নিদ্রার বিনাশে—
কোথা আছি কোথা যাই গো
জানি না গো এ-যে রাক্ষসের পুরী,
জানি না যে হেথা দিনে হয় চুরি,
জানি না বিপদ আছে ভূরি ভূরি—
সুধা ব’লে বিষ খাই গো।

ভাঙিতে আমার মনের সংশয়
জাগায়ে দিতেছ নিজপরিচয়,
তুমি-যে জনক জননী উভয়
বুঝাইছ সদা তাই গো।
সে কথা আমার কানে নাহি যায়,
ভুলিয়ে রয়েছি রাক্ষসীমায়ায়—
কী হবে, জননী, বলো গো উপায়।
শুধু কৃপাতিক্ষা চাই গো।

আঁধার সকলই দেখি তোমারে দেখি না যবে।
ছলনা চাতুরী আসে হৃদয়ে বিষাদবাসে
তোমারে দেখি না যবে, তোমারে দেখি না যবে
এসো এসো, প্রেমময়, অমৃতহাসিটি লয়ে।
এসো মোর কাছে ধীরে এই হৃদয়নিলয়ে।
ছাড়িব না তোমায় কভু জনমে জনমে আর,
তোমায় রাখিয়া হৃদে যাইব ভবের পার।

Public domain. Words and music by Rabindranath Tagore (1861–1941).