পরিশিষ্ট ৩

Rabindranath Tagore

পরিশিষ্ট ৩
এই গানগুলি রবীন্দ্রনাথের নানা গ্রন্থে মুদ্রিত, অথচ প্রথম সংস্করণ গীত
বিতানে (পরিশিষ্ট খ) যে গানগুলি রবীন্দ্রনাথের নয় বলিয়া নির্দিষ্ট তাহারই
একাংশ। রবীন্দ্রনাথের রচনা নয় যে, এ সম্পর্কে অন্য নির্ভরযোগ্য মুদ্রিত
প্রমাণ এপর্যন্ত পাওয়া যায় নাই। পরবর্তী গ্রন্থপরিচয় দ্রষ্টব্য।

এমন আর কতদিন চলে যাবে রে!
জীবনের ভার বহিব কত! হায় হায়!
যে আশা মনে ছিল, সকলই ফুরাইল—
কিছু হল না জীবনে।
জীবন ফুরায়ে এল। হায় হায়।

ওহে দয়াময়, নিখিল-আশ্রয় এ ধরা-পানে চাও—
পতিত যে জন করিছে রোদন, পতিতপাবন,
তাহারে উঠাও।
মরণে যে জন করেছে বরণ তাহারে বাঁচাও।

কত দুখ শোক, কাঁদে কত লোক, নয়ন মুছাও।
ভাঙিয়া আলয় হেরে শূন্যময়। কোথায় আশ্রয়—
তারে ঘরে ডেকে নাও।
প্রেমের তৃষায় হৃদয় শুকায়, দাও প্রেমসুধা দাও।

হেরো কোথা যায়, কার পানে চায়। নয়নে আঁধার—
নাহি হেরে দিক, আকুল পথিক চাহে চারি ধার।
এ ঘোর গহনে অন্ধ সে নয়নে তোমার কিরণে
আঁধার ঘুচাও।
সঙ্গহারা জনে রাখিয়া চরণে বাসনা পূরাও।

কলঙ্কের রেখা প্রাণে দেয় দেখা প্রতিদিন হায়।
হৃদয় কঠিন হল দিন দিন, লজ্জা দূরে যায়।
দেহ গো বেদনা, করাও চেতনা! রেখো না, রেখো না—
এ পাপ তাড়াও।
সংসারের রণে পরাজিত জনে নববল দাও!

নিত্য সত্যে চিন্তন করো রে বিমলহৃদয়ে,
নির্মল অচল সুমতি রাখো ধরি সতত।
সংশয়নৃশংস সংসারে প্রশান্ত রহো,
তাঁর শুভ ইচ্ছা স্মরি বিনয়ে রহো বিনত।
বাসনা করো জয়, দুর করো ক্ষুদ্র ভয়।
প্রাণধন করিয়া পণ চলো কঠিন শ্রেয়পথে,
ভোলো প্রসন্নমুখে স্বার্থসুখ, আত্মদুখ—
প্রেম-আনন্দরসে নিয়ত রহো নিরত।

মা, আমি তোর কী করেছি।
শুধু তোরে জন্ম ভ’রে মা বলে রে ডেকেছি।
চিরজীবন পাষাণী রে,ভাসালি আঁখিনীরে—
চিরজীবন দুঃখানলে দহেছি।
আঁধার দেখে তরাসেতে চাহিলাম তোর কোলে যেতে—
সন্তানেরে কোলে তুলে নিলি নে।
মা-হারা সন্তানের মতো কেঁদে বেড়াই অবিরত—
এ চোখের জল মুছায়ে তো দিলি নে।
ছেলের প্রাণে ব্যথা দিয়ে যদি, মা, তোর জুড়ায় হিয়ে
ভালো ভালো, তাই তবে হোক—
অনেক দুঃখ সয়েছি।

সকলেরে কাছে ডাকি আনন্দ-আলয়ে থাকি
অমৃত করিছ বিতরণ।
পাইয়া অনন্ত প্রাণ জগত গাহিছে গান
গগনে করিয়া বিচরণ।
সূর্য শূন্যপথে ধায়— বিশ্রাম সে নাহি চায়,
সঙ্গে ধায় গ্রহপরিজন।
লভিয়া অসীম বলছুটিছে নক্ষত্রদল,
চারি দিকে চলেছে কিরণ।
পাইয়া অমৃতধারানব নব গ্রহ তারা
বিকশিয়া উঠে অনুক্ষণ—
জাগে নব নব প্রাণ,চিরজীবনের গান
পূরিতেছে অনন্ত গগন।
পূর্ণ লোক লোকান্তর, প্রাণে মগ্ন চরাচর
প্রাণের সাগরে সন্তরণ।
জগতে যে দিকে চাই বিনাশ বিরাম নাই,
অহরহ চলে যাত্রীগণ।
মোরা সবে কীটবৎ,সমুখে অনন্ত পথ
কী করিয়া করিব ভ্রমণ।
অমৃতের কণা তবপাথেয় দিয়েছ, প্রভো,
ক্ষুদ্র প্রাণে অনন্ত জীবন।

সখা, তুমি আছ কোথা—
সারা বরষের পরে জানাতে এসেছি ব্যথা।
কত মোহ, কত পাপ, কত শোক, কত তাপ,
কত যে সয়েছি আমি তোমারে কব সে কথা।

যে শুভ্র জীবন তুমি মোরে দিয়েছিলে সখা,
দেখো আজি তাহে কত পড়েছে কলঙ্করেখা।
এনেছি তোমারি কাছে, দাও তাহা দাও মুছে—
নয়নে ঝরিছে বারি, সভয়ে এসেছি পিতা।
দেখো দেব, চেয়ে দেখো হৃদয়েতে নাহি বল—
সংসারের বায়ুবেগে করিতেছে টলমল।
লহো সে হৃদয় তুলে, রাখো তব পদমূলে—
সারাটি বরষ যেন নির্ভয়ে রহে গো সেথা।

সখা, মোদের বেঁধে রাখো প্রেমডোরে।
আমাদের ডেকে নিয়ে চরণতলে রাখো ধ’রে—
বাঁধো হে প্রেমভোরে।
কঠোর পরানে কুটিল বয়ানে
তোমার এ প্রেমের রাজ্য রেখেছি আঁধার ক’রে।
আপনার অভিমানে দুয়ার দিয়ে প্রাণে
গরবে আছি বসে চাহি আপনা-পানে।
বুঝি এমনি করে হারাব তোমারে—
ধূলিতে লুটাই আপনার পাষাণভারে।
তখন কারে ডেকে কাঁদিব কাতর স্বরে।

ছি ছি সখা, কী করিলে,কোন্ প্রাণে পরশিলে—
কামিনীকুসুম ছিল বন আলো করিয়া।
মানুষ-পরশ-ভরেশিহরিয়া সকাতরে
ওই-যে শতধা হয়ে পড়িল গো ঝরিয়া।
জান তো কামিনী-সতীকোমল কুসুম অতি—
দূর হতে দেখিবার, ছুঁইবার নহে সে।

দূর হতে মৃদু বায়গন্ধ তার দিয়ে যায়,
কাছে গেলে মানুষের শ্বাস নাহি সহে সে।
মধুপের পদক্ষেপেপড়িতেছে কেঁপে কেঁপে,
কাতর হতেছে কত প্রভাতের সমীরে।
পরশিতে রবিরশুকাইছে কলেবর,
শিশিরের ভরটুকু সহিছে না শরীরে।
হেন কোমলতাময়ফুল কি না ছুঁলে নয়—
হায় রে কেমন বন ছিল আলো করিয়া।
মানুষ-পরশ-ভরেশিহরিয়া সকাতরে
ওই-যে শতধা হয়ে পড়িল গো ঝরিয়া।

না সজনী, না, আমি জানি জানি, সে আসিবে না।
এমনি কাঁদিয়ে পোহাইবে যামিনী, বাসনা তবু পূরিবে না।
জনমেও এ পোড়া ভালে কোনো আশা মিটিল না।
যদি বা সে আসে, সখী, কী হবে আমার তায়।
সে তো মোরে, সজনী লো, ভালো কভু বাসে না— জানি লো
ভালো ক’রে কবে না কথা, চেয়েও না দেখিবে—
বড়ো আশা করে শেষে পূরিবে না কামনা।

Public domain. Words and music by Rabindranath Tagore (1861–1941).